ক্ষণিকের অতিথি
সানা আর আদিল ছোট বেলার বন্ধু। দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত একসঙ্গে পড়াশুনা।
উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর সানা স্বপরিবার দুবাই চলে যায়, সেখানে তার আব্বুর
নিজস্ব ডিপার্টমেটাল স্টোরের ব্যবসা এবং বাকি পড়াশুনা সেখানেই।
প্রায় পাঁচ বছর তাদের মধ্যে কোনও যোগাযোগ ছিল না। ইতিমধ্যে আদিল বি-টেক পাশ
করে এক নামী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন করেছে। বেশ আকর্ষণীয় অফার
ছিল, ফাউ হিসেবে কলকাতাতে থাকার লোভ সে কিছুতেই সামলাতে পারে নি।
কথায় বলে বাল্যকালের প্রেম কখনও মরে না, সানা-আদিলের ক্ষেত্রেও একশ শতাংশ
প্রযোজ্য ছিল। ছোট্ট বেলা থেকেই একে অপরের পাশে থেকেছে, দুজনের মনের খুবই
মিল ছিল , সানা চলে যাওয়ার পর সেই ভাললাগা ধীরে ধীরে আদিলের হৃদয়ে কাঁটার
মত চুভতে লাগল। মাঝে মাঝেই একান্তে সানার কথা ভাবতো আর কল্পনায় চাক্ষুষ
করার চেষ্টা করত। ফোন নাম্বার জোগাড় করার যথেষ্ট চেষ্টা করেছিল, কিন্তু
কিছুতেই যোগাযোগ করতে পারে নি। সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় করেও সানার
কোনও হদিস পায় নি।
আদিল তার কিছু কলিগের সাথে গ্যাংটক থেকে ফিরছিল, এনজেপি, স্টেশন থেকে রাতের
দার্জিলিং মেলে ফেরার টিকিট, হাতে প্রায় তিন ঘন্টা মত সময় , ভাবলো নামকরা
হংকং মার্কেট ঘুরে এলে মন্দ কি? ওখানে নাকি চাইনিজ জিনিসপত্রের অঢেল
সম্ভার।
হংকং মার্কেট ঢোকার অল্প একটু দূরে বিধান মার্কেটে কাকতলীয় ভাবে সানার সাথে
সাক্ষাৎ, দুজনেই অবাক এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ়। গত পাঁচ বছরের উভয়ের মধ্যে
অনেক পরিবর্তন এসেছে, দু জন্যেই নাবালক থেকে সম্পূর্ণ সাবালক। সানা এখনও
সেই ছিপছিপে তন্বী আছে, বয়সের সাথে সাথে দেখতে আরও আকর্ষণীয়া হয়েছে। সানাকে
দেখে আদিলের খুশির অন্ত নেই এবং চোখ ফেরাতে পারছিল না, ঠিক পাগলের মতো
অবস্থা।
সানাও খুব খুশি। খুশির ঝলক তার চোখে মুখে স্পষ্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছিল এবং আদিলের মনের অবস্থা সানাও খুব ভালো করে বুঝতে পারছিল।
গত পাঁচ বছরে দুজনের মনের মধ্যে অনেক কথা
জমে ছিল। আদিলের তর সইছিল না। সানাকে বলল চলো কাছাকাছি কোনও রেস্তোরাঁয় বসে কিছু খাওয়া যাক আর সাথে গল্পগুজব।
সানা কিছু বলার আগেই, আদিল লক্ষ্য করল, এক সুদর্শন যুবক তাদের দিকে এগিয়ে
আসছে এবং ঠিক সানার পাশে এসে দাঁড়াল। জিজ্ঞাসার চোখে সানার দিকে চাইল।
সানা হাসিমুখে আদিলের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার হাসব্যান্ড রাহিল, আর এই সেই আদিল আমার ছোটবেলার বন্ধু।
রাহিল হাসিমুখে বলল, ও আপনিই আদিল! বিয়ের পর থেকেই শুধু আপনার কথা শুনে
আসছি। বলেই হাত বাড়ালো, আদিল সৃষ্টাচার সুলভ ডান হাতটি বাড়িয়ে দিল।
সল্পক্ষণের সাক্ষাতে আদিল অসম্পূর্ণ স্বপ্ন বুনতে শুরু করেই ছিল কি, নিমিষে
তা ছিন্ন ভিন্ন ছারখার হয়ে গেল।
বাগডোগরা থেকে ফ্লাইট ধরবে বলে রাহিল আর সানা তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল,
ঘটনাগুলো সব এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল, আদিলের কিছুই করার ছিল না। কিছুই
জিজ্ঞাসা করা হল না।
ট্যাক্সিতে বসার আগে রাহিল নিজের ভিজিটিং কার্ড আদিলের হাতে তুলে ধরে তাড়াহুড়োতে বেরিয়ে গেল। আর শুধু বলল ফোনের অপেক্ষায় থাকবো।
বেশ কিছুক্ষণ ঘোরের মধ্যে কেটে গেল। আদিলের হাত-পা অসাড় হয়ে আসছিল, অল্প
অল্প শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল এবং ধপাস করে পাশের দোকানের তক্তাপোশে বসে পড়ল।
অজান্তে এক এক করে জামার বুকের বোতামগুলো খুলে ফেলল।
একটু ধাতস্থ হওয়ার পর কার্ডটি না দেখেই কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলল।।
0 Comments